শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

মা ও মাটির অপূর্ব অন্বয়: আমার মা

জাকির হুসাইন

বাইরে যেসব উদ্দীপনা আলোড়ন আর আন্দোলিত হবার চিত্র চোখে দেখা যায়, তারচেয়ে অনেক বেশি মাত্রার আলোড়ন উদ্দীপনার বসতি মানুষের মন। যে উদ্দীপনা দেখা যায় না, যে আলোড়ন দেখানো যায় না; একান্ত ব্যক্তিপর্যায়ের শিহরণেই থেকে যায় সীমাবদ্ধ হয়ে। ব্যক্তিপর্যায়ের সেই শিহরণকে, ব্যক্তিগত অধরা অনুভবকে ধরতে পারার জন্য, বিভিন্ন মাধ্যমের আশ্রয়ও নিয়ে থাকেন অনেকেই। যাঁরা এসব মাধ্যম গ্রহণ করে নিজস্ব অনুভবকে প্রকাশ করেন বৈচিত্র্যপূর্ণ উপায়ে তাঁরা কেউ কবি, কেউ গল্পকার, কেউ গীতিকার কিংবা কেউ ঔপন্যাসিক। প্রাচীনতার বিচারে অনুভব প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে কবিরাই এই অঙ্গনে এগিয়ে, সেকথা সবারই জানা। ঐতিহাসিকভাবে কবিরা তাঁদের অনুভবকে জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য তাই কালির অক্ষরে লিখে রাখেন নিজস্ব আলোড়ন উদ্দীপনা আর শিহরণের কথা। সক্ষমতা আর যোগ্যতার বিচারে সেসব কথার খুব সামান্যই থেকে যায় মানুষের ইতিহাসের অংশ হয়ে, কালের গহ্বরে হারিয়ে যায় তার বৃহৎ অংশ। কিন্তু সময়ের সেই বিচারের পূর্বে সেসব অনুভব, লিখে রাখা সেসব শিহরণের সাক্ষী হয় বড় সংখ্যক মানুষ। পরিচিত হয় কবির একান্ত অনুভবের বসতি অঞ্চলের সাথে। সেই অনুভবের বসতিতে থাকে সহজ, কঠিন, জানা, অজানা, গ্রহণযোগ্য, অগ্রহণযোগ্য বিবিধ প্রকারের অনুভূতির উপস্থিতি; যা সাধারণভাবে সবার সাথে নাও মিলতে পারে। কিন্তু যে নারীর উদর থেকে পৃথিবীতে আগমন ঘটে প্রতিটি মানুষের; তাঁকে জানি ‘মা’ নামে। তার ব্যাপারে, তাঁর সাথে, তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসার, আমাদের অনুভবের, আমাদের শিহরণের এক সাধারণ (পড়সসড়হ) রূপ থাকে সবার মাঝেই। তাই যখন কবিতার অক্ষরে বন্দী করেন কোনও কবি তার নিজস্ব মায়ের অনুভব; তখন তা নিজস্বতার সীমানা পেরিয়ে সব পাঠকের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যায় ব্যতিক্রমী এক আলোড়নে, শিহরণে। যেমন গাজী নজরুল ইসলাম যখন মায়ের কথা স্মরণ করে বলেনѓতোমার শাড়ির আঁচল মুড়ে আগলে তুমি রাখতে যাকে/মন চাতকীর পরান ফাটা দৃষ্টি মেলি আঁখির ফাঁকে।” তখন পাঠকের মন-পর্দায় ভেসে ওঠে মায়ের আঁচলের ছোঁয়া, রঙ ও গন্ধের আবছা ও টাটকা অনেক ছবির সারি। পাঠক যেন সেই পঙ্ক্তিকে নিজের স্মৃতির সাথে মিলিয়ে নেন, আপন করে নেন নিবিড়ভাবে। 

বলছি গাজী নজরুল ইসলামের লেখা “আমার মা” গ্রন্থের কথা। একুশটি কবিতার এক ছোট্ট সংকলন এই গ্রন্থ, যেখানে নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মাকে নিয়ে অনেক স্মৃতি ও ভাবনার সমাবেশ ঘটেছে; সাথে সাথে পিতার একাধিক স্মৃতির ছবিও স্থান পেয়েছে একান্ত আপন মমতা ও ভালোবাসায়। একেকটা কবিতায় অনুষঙ্গ হয়েছে মায়ের স্নেহ, বিরহ, আদর, দো’আ ইত্যাদির একেকটি স্মৃতির দৃষ্টিকোণ; স্থান পেয়েছে মাটির সাথে মায়ের অন্বয়ের কথা, সততা ও সুন্দরের শিক্ষা প্রাপ্তির আখ্যান।

নজরুল ইসলাম তাঁর মায়ের মায়া ও মুখের স্মৃতি থেকে তুলে এনেছেন প্রকৃতির পরাগমাখা প্রলেপ দিয়ে। যখন তিনি মায়ের শাড়ি ও ওড়নার কথা বলেন তখন সেখানে চিত্রায়িত হয় গ্রামীণ ফুল ও পাতার প্রকৃত রঙের সম্পৃক্ততা। মায়ের ওড়নাকে তিনি দেখেছেন ঝিঙে ফুলের হলুদে এবং শাড়িকে চিত্রায়িত করেছেন কলাপাতার সবুজে, “ঝিঙে ফুলে ওড়নায় কলাপাতা শাড়িটা/মাটি মাখা মনোরম গোলপাতা বাড়িটা” কবির কাছে ‘ গোলপাতা’র ছাউনি আর মাটির দেয়ালের বাড়ির সাথে মায়ের শাড়ি ও ওড়না যেন একাকার হয়ে গেছে। মায়ের ছবি ও চিত্রকল্পে একাকার হয়ে ধরা দিয়েছে জন্মভিটে বাড়িটার কথাও। ‘আমার মা কাঞ্চন’ কবিতায় কবির কাছে মা, মাটি, উদ্ভিদ ও ফসলের অনুষঙ্গ সমান্তরালে কিংবা অন্বিত হয়ে ধরা দিয়েছে। সেই সাথে গোলপাতার বাড়ির ছবি এঁকে এর সাথে তিনি পাঠকের মনে সুন্দরবনের এক মোহনীয় রূপের সম্পৃক্ততাও উপস্থিত করতে চেয়েছেন। তাই কবিতা যেমন ব্যক্তির মায়ের স্মৃতি ও ছবিকে তুলে ধরেছে, তেমনি কবির জনপদের চিত্রকেও অঙ্কিত করেছেন অবিচ্ছিন্ন উপাদান হিসেবে। প্রকৃতির অযুত অনুষঙ্গের ভেতর থেকে কবিতায় উঠে এসেছে বিকেলের বাতাসও, কবি নিজ মায়ের চুলকে বিকেলের সমীরণ ভেবেছেন, যে বাতাস কবিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় সময়ে অসময়ে অথবা বিষণœ বিকেলে বাতাসের ছুঁয়ে দেওয়া ক্ষণে কবি নিজ মায়ের সেই চুলের ছোঁয়া অনুভব করতে থাকেন, যিনি হেঁটে যাচ্ছেন যেন দুই পাশে ফুটে থাকা বুনোফুলের রাস্তা দিয়ে, যে রাস্তা সাপের মতো একেবেকে চলেছে; গ্রামীণ সেই রাস্তাকে কবির চোখে মায়ের চুলের সিঁথি হয়ে ধরা দিয়েছে, “চুলগুলি চলমান বিকেলের সমীরণ/সর্পিল সিঁথি-পথ বনফুলে বিচরণ” কী অপূর্ব মেলবন্ধন!  প্রাণ ও প্রকৃতি; অনুভব ও কল্পনার অসাধারণ সমন্বয়। 

মায়ের দু’আ মুনাজাতে সন্তানের কল্যাণ প্রার্থনার উপস্থিতি থাকে আবশ্যিক হয়ে। প্রার্থনা আর গভীর রাতের সিজদায় মহান মালিকের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়ে যখন সন্তানের কথা বলেন, তখন তা সন্তানের নিরাপত্তা আর কল্যাণের ফল্গুধারা বয়ে আনে অহরহ। কবি মায়ের এমন প্রার্থনার স্মৃতিও মায়ের স্মৃতির সাথে জড়িয়ে দিয়েছেন ‘তাপস্বী মা’ কবিতায়, “নিঃঝুম-নিশীথের একক জায়নামাজে সিজদাবনত তপস্বী/যার কলিজা-নিংড়ানো দোয়া আর আশীর্বাদে সিক্ত/আমার জীবনের পথ”। মায়ের এসব একাগ্র প্রার্থনা কবির কাছে ‘জীবনের সঞ্চালিকা শক্তি হিসেবে ধরা দেয়।

কবির চোখে প্রকৃতির অন্য প্রাণিদের মধ্যকার মাতৃত্বের ছবিও ধরা পড়েছে মানবিক ফ্রেমের ফোকাসে। বাৎসল্যের এক অনন্য সাধারণ চিত্রকল্প যেমন ফুটে উঠেছে গ্রন্থের ‘মায়ের ভালোবাসা’ কবিতায়, “ঠোঁটের ডগায় খাদ্য এনে খাওয়ায় তাদের ছানা/অনেক সময় নিজের পেটে যায় না ক্ষুধার দানা”। কিংবা “দুইটি পাখি বুলবুলিরা মায়ে-বাপে মিলে/বাচ্চাগুলি লালন করে হৃদয় তিলে তিলে”। পাখিদের মাতৃত্ব-বাৎসল্যের আরও একটি উপস্থাপন পাওয়া যায় ‘মধুর সুধা মা’ কবিতায়, “কোকিল ডাকে কুহু /কাক যে ডাকে কা/ওদের ডাকতো বুঝতে পারে/ওদের সোনার মা”। সন্তানের স্বরধ্বনি মায়ের কাছে পরম পরিচিত, তাই প্রাণিজগতের এসব স্বরধ্বনি আমাদের কাছে অদ্ভুত লাগলেও ঠিকই সেই মায়েদের মাতৃত্বে এসব ডাকের কারণে এক অন্যরকম ঢেউ খেলে যায় মমতার জোয়ারে। 

এভাবে জীবন, জগত, প্রাণ, প্রকৃতির সাথে মা ও মাটির সংযোগ সম্পর্কের এক অপূর্ব সমন্বয় সামঞ্জস্যতার বয়ান পাওয়া যায় জনাব গাজী নজরুল ইসলামের ‘আমার মা’ গ্রন্থের পঙ্ক্তির পরতে পরতে। জীবনের অর্জন ও অভিজ্ঞতা, অনুভব ও অভিপ্রায় থেকে উৎসারিত এসব কথামালা সেজেছে দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের জনমানুষের নেতা নজরুল ইসলামের কাব্যকলমে। পাঠক বইটির পাতা থেকে এ অঞ্চলের মাটি ও মায়ের ঘ্রাণ পেতে সক্ষম হবেন, সেই প্রত্যাশা। ‘আমার মা’  গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে গ্রন্থকুঞ্জ প্রকাশন। প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৩, মূল্য: ১৬০ টাকা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ